ওড়িশার বুকে শুয়ে থাকা চিল্কা হ্রদ এশিয়ার সবচেয়ে বড় নোনাজলের হ্রদ। প্রায় ১,১০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই হ্রদে পাখি, ডলফিন, ছোট ছোট দ্বীপ আর জেলেদের জীবন মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা। যাঁরা প্রকৃতির কাছাকাছি কিছুদিন কাটাতে চান, তাঁদের জন্য চিল্কা একেবারে আদর্শ জায়গা। নিচে ধাপে ধাপে জেনে নেওয়া যাক কোথায় কোথায় ঘুরবেন, কীভাবে পৌঁছবেন আর কোথায় থাকবেন।

দেখার মতো জায়গা
১. নলাবন পাখি অভয়ারণ্য
চিল্কার একদম মাঝখানে থাকা এই দ্বীপটি শীতকালে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির ঠিকানা হয়ে ওঠে। সাইবেরিয়া, মধ্য এশিয়া এমনকি হিমালয় থেকেও পাখিরা এখানে আসে। বর্ষায় দ্বীপটি জলের তলায় ডুবে যায়, তাই সেরা সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। বারকুল থেকে নৌকা ভাড়া করে যেতে হয়, সময় লাগে প্রায় তিন-চার ঘণ্টা।
২. সাতপাড়া ও ইরাবতী ডলফিন
পুরী থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে সাতপাড়া বিরল প্রজাতির ইরাবতী ডলফিন দেখার জন্য বিখ্যাত। পৃথিবীর হাতে গোনা যে দুটি জায়গায় এই ডলফিন দেখা যায়, তার একটি চিলিকা। সকালের দিকে জল শান্ত থাকে বলে তখনই নৌকাভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময়। কাছেই সি-মাউথ পয়েন্ট, যেখানে হ্রদ গিয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে।
৩. কালীজাই মন্দির
বারকুলের কাছেই একটি ছোট দ্বীপে দেবী কালীজাইয়ের মন্দির। স্থানীয় জেলে ও নাবিকদের কাছে এটি অত্যন্ত শ্রদ্ধার জায়গা, যাত্রার নিরাপত্তার জন্য এখানে পুজো দেওয়া হয়। প্রতি বছর মকরসংক্রান্তির সময় এখানে বড় মেলা বসে।
৪. রম্ভা ও তার দ্বীপমালা
রম্ভা থেকে নৌকায় ঘুরে দেখা যায় ব্রেকফাস্ট আইল্যান্ড, হানিমুন আইল্যান্ড আর বার্ডস আইল্যান্ড। ব্রেকফাস্ট আইল্যান্ডে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে সকালের জলখাবার সারার মজাই আলাদা। আশেপাশের পাহাড় আর জলাভূমি মিলিয়ে এই এলাকা ছবির মতো সুন্দর।
৫. বারকুল
বারকুল মূলত নৌকাভ্রমণের প্রবেশদ্বার — এখান থেকেই নলাবন আর কালীজাই মন্দিরের দিকে নৌকা ছাড়ে। থাকা-খাওয়ার সুবিধা ভালো থাকায় অনেকেই এখানে ঘাঁটি গেড়ে আশপাশের জায়গাগুলো ঘুরে দেখেন।
৬. মঙ্গলজোড়ি
একসময় পাখি শিকারিদের গ্রাম হিসেবে পরিচিত মঙ্গলজোড়ি আজ পাখি সংরক্ষণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ঐতিহ্যবাহী দেশি নৌকায় চেপে খুব কাছ থেকে পাখি দেখার অভিজ্ঞতা এখানে পাওয়া যায় বলে একে "এশিয়ার পাখিস্বর্গ"ও বলা হয়। ভুবনেশ্বর থেকে গাড়িতে দেড় ঘণ্টার পথ।
৭. রাজহংস দ্বীপ
সাতপাড়ার কাছে ছোট্ট এই দ্বীপের একদিকে হ্রদ, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর। সবুজ ঝোপঝাড় আর বালুকাবেলার মিশেলে এটি পিকনিক আর নিরিবিলি সময় কাটানোর জন্য দারুণ জায়গা।
৮. ঘণ্টাশিলা পাহাড় ও বীকন আইল্যান্ড
রম্ভার কাছেই ছোট একটি পাহাড় ও তার গায়ে ব্রিটিশ আমলের তৈরি একটি বাতিস্তম্ভ। ইতিহাসের ছোঁয়া আর হ্রদের নীল জলের মিশেলে জায়গাটি একটু কম চেনা হলেও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বেশ প্রিয়।
কীভাবে পৌঁছবেন
বিমানে: সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর ভুবনেশ্বরের বিজু পট্টনায়ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এখান থেকে বারকুল প্রায় ৬০-১০৫ কিলোমিটার, রম্ভা প্রায় ১৩০ কিলোমিটার আর সাতপাড়া প্রায় ১১০ কিলোমিটার দূরে। বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সি বা সরকারি বাসে করে সহজেই পৌঁছানো যায়।
ট্রেনে: কলকাতা-চেন্নাই মেন লাইনে বালুগাঁও রেলস্টেশন চিলিকার সবচেয়ে কাছের স্টেশন, হ্রদ থেকে দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার। কলকাতা, চেন্নাই, হায়দরাবাদ, বিশাখাপত্তনম ও ভুবনেশ্বর থেকে একাধিক ট্রেন এখানে থামে।
সড়কপথে: জাতীয় সড়ক ১৬ (কলকাতা-চেন্নাই হাইওয়ে) বারকুল ও বালুগাঁওয়ের খুব কাছ দিয়ে গেছে। ভুবনেশ্বর থেকে বারকুল যেতে গাড়িতে লাগে দেড় ঘণ্টার মতো। পুরী থেকে সাতপাড়া প্রায় ৫০ কিলোমিটার। ভুবনেশ্বর, পুরী, কটক ও বেরহামপুর থেকে নিয়মিত সরকারি (ওএসআরটিসি) ও বেসরকারি বাস চলে বালুগাঁও ও রম্ভার দিকে। ট্যাক্সি ভাড়া করে বা নিজে গাড়ি চালিয়েও যাওয়া যায়।
একবার হ্রদের ধারে পৌঁছে গেলে বারকুল ও রম্ভা থেকে সরকারি সংস্থার (ওটিডিসি) নৌকা ভাড়া করে বিভিন্ন দ্বীপে যাওয়া যায়। ৭ আসনের ছোট নৌকা থেকে শুরু করে ৩৪ আসনের বড় নৌকা, চাহিদামতো বেছে নেওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন
ওড়িশা পর্যটন উন্নয়ন নিগমের (ওটিডিসি) পান্থনিবাস বারকুল, রম্ভা ও সাতপাড়ায় রয়েছে — এসি ও নন-এসি ঘর, এমনকি ডরমিটরির ব্যবস্থাও আছে, বাজেট অনুযায়ী বেছে নেওয়া যায়। যাঁরা প্রকৃতির আরও কাছাকাছি থাকতে চান, তাঁদের জন্য বেরহামপুর, রাজহংস আর মঙ্গলজোড়িতে রয়েছে নেচার ক্যাম্প। এছাড়া বালুগাঁওয়ে বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল আছে, যা কম খরচে থাকার সুবিধা দেয়। থাকার জায়গা যেখানেই হোক, হ্রদের তাজা চিংড়ি ও কাঁকড়ার পদ চেখে দেখতে ভুলবেন না।
যাওয়ার সেরা সময়
পাখি দেখার শখ থাকলে অক্টোবর থেকে মার্চ, বিশেষত ডিসেম্বর-জানুয়ারি সবচেয়ে ভালো সময়। ডলফিন দেখার জন্য শীত ও বসন্তের সকালগুলো আদর্শ। বর্ষাকালে (জুন-সেপ্টেম্বর) নলাবন দ্বীপ জলের তলায় থাকে বলে সেই সময়টা এড়িয়ে চলাই ভালো।
চিল্কা শুধু একটা হ্রদ নয়, এটি এক জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র — যেখানে পাখির ডানার শব্দ, ডলফিনের লুকোচুরি আর জেলেনৌকার ছন্দ মিলে তৈরি করে অন্যরকম এক শান্তির অনুভূতি।